কাজী নজরুল ইসলাম

বইমেলার প্রথম শুক্রবারেই ভিড়, ভালো বিক্রির ‘আভাস’

মাসব্যাপী ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৪’-এর শুরুর প্রথম দিনটি কেটেছে অব্যবস্থাপনায়। অনেক স্টলসহ মেলার বিভিন্ন অংশ ছিল বেশ অগোছালো। তার ওপর সন্ধ্যায় বাগড়া দিয়েছে বৃষ্টি। সব মিলিয়ে প্রথম দিনে শুরু হয়েও যেন শুরু হয়ে ওঠেনি বইমেলা। আজ শুক্রবার (২ ফেব্রুয়ারি) ছিল মেলার দ্বিতীয় দিন, আর প্রথম ছুটির দিন। যদিও সকালের দিকে গতকালের রেশ ছিলই। তবে দুপুরের পর থেকেই বাড়তে শুরু করে লোকসমাগম। একপর্যায়ে দর্শনার্থীদের বেশ ভিড়ও দেখা গেছে মেলায়। মেলার দ্বিতীয় দিনেই এমন চিত্র দেখে এ বছর বইমেলা বেশ জমে উঠবে বলে ধারণা করছেন বিক্রেতারা।

বইমেলার দ্বিতীয় দিনের সকালটা ছিল শিশুদের জন্য। আয়োজক বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় আজ সকালে বইমেলার শিশু চত্বরে আয়োজন করা হয় শিশুপ্রহর। সকাল সাড়ে ১১টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশু চত্বরে ‘শিশুপ্রহর’ উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। এসময় বিশেষ আয়োজনে জনপ্রিয় শিক্ষামূলক টেলিভিশন ধারাবাহিক সিসিমপুরের হালুম, টুকটুকি, ইকরি, শিকুর সঙ্গে নাচে-গানে মেতে ওঠে শিশুরা।

বইমেলা-শিশুপ্রহর
বইমেলার শিশুপ্রহরে ছিল শিশুদের সমাগম (ছবি: প্রতিবেদক)

সিসিমপুরের স্টল ঘিরে শিশুদের কিছুটা ভিড় থাকলেও বিকাল পর্যন্ত মেলা ছিল বেশ ফাঁকা। তবে বিকাল হতেই বাড়তে থাকে বইপ্রেমীদের ভিড়। প্রিয়জনদের সঙ্গে মেলায় এসে উৎসুক চোখে নতুন বইয়ের পাতা উল্টিয়ে দেখছেন কেউ। আবার কেউ কেউ বই ও লেখকদের সঙ্গে তুলছেন ছবি। কেউ আবার মেতে উঠেছেন আড্ডায়।

দ্বিতীয় দিনেই এমন দর্শনার্থীর আগমনে বিক্রি বাড়ার বার্তা হিসেবে দেখছেন বিক্রেতারা। তারা বলছেন, দ্বিতীয় দিনেই লোকসমাগম হচ্ছে, এটা ভালো দিক। মেলার প্রথম দিকে আসলে বিক্রি তেমন একটা হয় না। সবাই এসে উল্টেপাল্টে বই দেখেন। অনেকেই লিস্ট তৈরি করেন। মেলার শেষের দিকে এসে লিস্ট অনুযায়ী বই কিনে নিয়ে যান। সেই তুলনায় এবার দ্বিতীয় দিনেই বেচাকেনাও হয়েছে।

আগামী প্রকাশের বিক্রয়কর্মী সোহাগ বলেন, ‘গতকাল লোকজন একদমই ছিল না। মেলাও পুরোপুরি শুরু করতে পারেনি অনেকেই। আজ সকাল থেকে যারা এসেছেন তাদের অনেকেই শিক্ষার্থী। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব বয়সের দর্শনার্থী বেড়েছে। গতকাল বিক্রিও ছিল না বললেই চলে। আজ দর্শনার্থী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বেড়েছে। আজকে মোটামুটি ব্যস্ত সময় পার করছি বলা যায়।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যস্ততা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন এই তরুণ।

বইমেলা-ভিড়-05
স্টলগুলোতে ছিল পাঠকদের ভিড় (ছবি: প্রতিবেদক)
ভাষা চিত্রের বিক্রয়কর্মী রওশন আলম বলেন, ‘আজ দর্শনার্থী অনেক বেড়েছে। আজকের তুলনায় গতকাল দর্শনার্থী পাঁচ শতাংশও ছিল না। তার ওপর আবার বৃষ্টিও ছিল। আজকে দর্শক বেড়েছে, তবে বিক্রি তুলনামূলক কম। যদিও একেবারের শুরুর দিক। তাই প্রত্যাশা করছি, বিক্রি বাড়বে। আর প্রথম দিকে সবাই এসে ঘোরাঘুরিই করে।’

বিক্রয়কর্মীদের কথার মিল পাওয়া গেলো দর্শনার্থী নুসাইবা রহমানের কথাতেও। কেমন লাগছে জানতে চাইলে নুসাইবা বলেন, ‘মেলায় বন্ধু-বান্ধবরা মিলে ঘুরতে এসেছি, গতকালও এসেছিলাম। প্রথম দিকে ঘুরে ঘুরে বই দেখছি, ভালো লাগলে লিস্ট করছি। বইকেনার জন্য বাজেট কতটুকু পাওয়া যাবে, সবকিছু চিন্তা করে এই লিস্ট আবার কাট-ছাঁট হবে। শেষ দিকে এসে বই কিনবো। প্রথম দিকে ঘোরাঘুরি, আড্ডা দিতেই ভালো লাগে।’

আগে থেকেই বলা হচ্ছিল, এবারের বইমেলায় নতুন মাত্রা যোগ করবে শহরের নতুন গণপরিবহন মেট্রোরেল। তবে আজ শুক্রবার মেট্রোরেল সাপ্তাহিক বন্ধ ছিল। তারপরও লোকসমাগম সন্তোষজনক, মেট্রোরেল চালু থাকলে তা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বইমেলা-ভিড়-02
বিকালে জমে ওঠে বইমেলা (ছবি: প্রতিবেদক)
আজকের নতুন বই

বইমেলার দ্বিতীয় দিন শুক্রবার (২ ফেব্রুয়ারি) মেলা শুরু হয় সকাল ১১টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। বইমেলা আজ ছিল শিশুপ্রহর। আজ নতুন বই এসেছে ৩১টি।

মূল মঞ্চের আয়োজন

বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: মহাকবি আলাওল’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইমন জাকারিয়া। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মিল্টন বিশ্বাস এবং মোহাম্মদ শেখ সাদী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মো. আবুল কাসেম।

আলোচনায় সাইমন জাকারিয়া বলেন, ‘বাঙালি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের অবাঙালি গবেষকদের বিচারে খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতকের কবি আলাওল মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আখ্যান কবি হিসেবে স্বীকৃত। আলাওল রচিত পদ্মাবতী, সিকান্দরনামা, তোহ্ফা, রাগতালনামা ও পদাবলি এবং কাজী দৌলতের সতী-ময়না লোর-চন্দ্রাণী’র শেষাংশ হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপির সাহায্যে সম্পাদিত গ্রন্থাকারে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন নতুন তথ্যের আলোকে মহাকবি আলাওলকে যে তত্ত্বীয় পরিসরে গবেষকরা উপস্থাপন করছেন, তাতে তার সাহিত্যের গভীরতা, দূরদৃষ্টি-সম্পন্নতা এবং মহাকাল স্পর্শের ক্ষমতা স্পষ্ট হয়।’

সভায় আলোচকরা বলেন, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিকর্ম ‘সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’। এই কাব্যের পরিচয় কেবল আখ্যানকাব্য বা প্রণয়োপাখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এই কাহিনি কিচ্ছা আকারে যাত্রাপালায়ও পরিবেশিত হয়েছে। কাজেই এই পুঁথির আবেদন অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি রুবী রহমান, আসাদ মান্নান এবং মাহবুব সাদিক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী লায়লা আফরোজ, মুস্তাফা ওয়ালিদ এবং মজুমদার বিপ্লব।

এছাড়া ছিল ড. আবুল কালাম আজাদ-এর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ লোকসংগীত পরিষদ’ এবং ড. মো. শাহাদাৎ হোসেন-এর পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদ’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী তিমির নন্দী, মহিউজ্জামান চৌধুরী, প্রিয়াংকা গোপ, জুলি শারমিলি এবং মানিক রহমান।

শনিবারের সময়সূচি

তৃতীয় দিন শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর।

এদিন আলোচনা অনুষ্ঠানে বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘দ্বিশতজন্মবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি: মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রফিকউল্লাহ খান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন, খসরু পারভেজ এবং হোসনে আরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মুহম্মদ নূরুল হুদা।